আজ শনিবার , ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ |

শিরোনাম

রিফাত হত্যা রায় ৩০ সেপ্টেম্বর ! মিন্নির সাজা হবে কি? টাংগাইল সদরের (বুরো এনজিও) কর্মকর্তা খুন। মতলব উত্তরে আধুনিক প্রযুক্তিতে বীজ উৎপাদন সংরক্ষনে মাঠ দিবস অনুষ্টিত টাংগাইলে জেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুজ্জামান লিটন কে কুপিয়ে হত্যা চেস্টা। টাংগাইলে চতুর্থ শ্রেণির (১০) এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা। রাঙ্গাবালীতে বিয়ের প্রতিশ্রæতিতে প্রতারণার অভিযোগ, চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হালুয়াঘাটে বিজিবি’র পিটুনিতে আহত-১ প্রশ্নবিদ্ধ টি.এইচ.ও ডা. সোহেলী শারমিন! কোটি টাকার দূর্ণীতির নেপথ্যে–? হালুয়াঘাটে নারী সোর্স সুমিসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজীর অভিযোগ বাউফলে এক ব্যক্তির চোখ উৎপাটন হালুয়াঘাটে সুমী’র অপকর্ম ফাঁস! প্রতিবাদে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ ২৪ ঘণ্টায় আরো ৪১ জনের মৃত্যু, শনাক্ত ১৮২৭ রূপগঞ্জ প্রেসক্লাবের স্বঘোষিত সভাপতির হুমকিতে ৫ সাংবাদিক এলাকাছাড়া করোনায় আরও ৩৬ জনের মৃত্যু মসজিদে এসি বিস্ফোরণে মৃত বেড়ে ২৮

হালুয়াঘাটের ঐতিহ্যবাহী ঈদোৎসব

প্রকাশিতঃ ৯:২৮ অপরাহ্ণ | জুন ১৫, ২০১৮ । এই নিউজটি পড়া হয়েছেঃ ২১৬ বার

আবির মাহমুদ:  ঈদ মুসলিম জাতির সর্বোৎকৃষ্ট ধর্মীয় দু’টি উৎসব। ঈদুল ফিতর বা রোজার ঈদ এবং ঈদুল আযহা বা কুরবানীর ঈদ। ঈদ আমাদের হৃদয়কে করে আনন্দে মাতোয়ারা। ছোট-বড় সবার হৃদয়ে ঢেউ খেলে যায় আনন্দ-উৎসবের জোয়ার। বাংলায় মুসলিম শাসনামল থেকেই ঈদোৎসব পালিত হতো হালুয়াঘাটের বুকে। প্রাচীন ঈদগাহ মাঠ ও কয়েকটি মসজিদের কারুকার্য দেখে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। হালুয়াঘাটের মুসলিম অধিবাসীগণ সেই প্রাচীন আমল থেকেই ইদ আনন্দকে বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে এক অনন্য বৈশিষ্টের মধ্য দিয়ে উদযাপন করে আসছেন। ইদের সময় প্রতিটি ইদগাহ মাঠ মুসল্লিদের আকর্ষণের জন্য রঙিন নিশান, শামিয়ানা, কৃত্রিম গেইট ও আলো দিয়ে সাজানো হতো। বর্তমানে অনেক ঈদগাহ মাঠ ইট-সিমেন্টে পাকা করে ফেলা হয়েছে।হালুয়াঘাটে তখনো মাইক কিংবা লাউড স্পিকারের ব্যবস্থা না থাকায় ইদের নামাযের সময় প্রচারের জন্য, কখনো টিন পিটিয়ে বা টিনের চোঙ্গা ফুঁকে মহল্লায় মহল্লায় নামাযের সময় জানানো হতো। এ সময়টা বেশি দূরের নয় মাত্র ৩৫/৪০ আগেকার সময়। ঈদের দিনে প্রত্যেক বাড়িতেই খুব সকালে উঠার একটা সাজসাজ রব পড়ে যেত। ছেলেমেয়েরা গোসল সেরে সাজগোছ করে নামাযের আগেই বেরিয়ে পড়তো। ঈদের দিনে মুসলমানদের মথায় মাথায় দেখা যেত সেকালের অতি পরিচিত তুর্কি টুপি।পাকিস্তান আমলে করো কারো মাথায় দেখা যেত জিন্নাহ টুপি। আজকাল দেখা যায় সাদা পাঁচকল্লি, জালি ও কারুকার্যখচিত বিভিন্ন বাটি টুপি। ঈদের সময় টুপি ও আতর না কিনলে যেন ঈদমার্কেটের পূর্ণতাই আসে না। হালুয়াঘাটের উল্লেখযোগ্য ঈদগাহ মাঠগুলো হলো- হালুয়াঘাট কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠ, বাঘাইতলা মাঠ, মাজরাকুড়া মাঠ, ছাতুগাঁও মাঠ, নাশুল্লা মাঠ, ধুরাইল মাঠ, শাকুয়াই মাঠ ইত্যাদি। এসব মাঠে বহুকাল থেকে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। একসময় নামাযের ইমামতিতে নোয়াখালী হুজুররাই বেশি থাকতো। এরপর জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ঈদের জামাতের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। বর্তমানে প্রত্যেক এলাকার মসজিদে মসজিদে ঈদের জামাত হতে দেখা যায়। ঈদের আগে রমযানের চাঁদ দেখার পর পরই বাড়িতে মহিলা তৎপর হয়ে উঠতো সেমাই তৈরি করতে। চাল ভিজিয়ে ঢেঁকিতে কুটে গুঁড়ো করা হতো। এই চালের গুঁড়ো পানিতে গুলে হাতে পাকিয়ে মিহি, মোটাসহ নানা ধরণের সেমাইয়ে রূপ দেওয়া হতো। সাথে নানা ধরণের পিঠাও তৈরি করতো। পাড়ার মহিলারা দল বেধে ঘরে বসে এসব কাজ করতো। এ সময় কয়েকজন একসাথে সুর ধরে গীত গাইতো আর সেমাই তৈরি করতো। হালুয়াঘাটের আঞ্চলিক ভাষায় হাতে পাকানো সেমাইকে বলে ‘সয়াই’। কলের সেমাই বাজারে আসাতে বাড়ির মহিলাদের সেই আনন্দ বন্ধ হয়ে গেল। ঈদের দিন এই সেমাই পাক নিয়ে চলতো এক পরিক্ষীণ। মেহমান এলেই সেমাই পরিবেশন করা হতো তাঁদের সম্মানে। মুখে দিয়ে তাঁরা বলতেন কোন বাড়িতে সেমাই এর স্বাদ কী রকম হয়েছে। ঈদ আসার ক’দিন আগে থেকেই রং ফর্সা করার জন্য হলুদের প্রলেপ একং হাত রাঙাবার জন্য কাঁচা মেহেদি পাটায় পিষে ব্যবহারের প্রচলন ছিল। ঈদ বাজারে নানা রকম প্রসাধন ক্রীম, লিপস্টিক, মেহেদি ইত্যাদি আসাতে হলুদ আর কাঁচা মেহেদির প্রচলন দেখা যায় না। হালুয়াঘাটের ঈদোৎসবে খেলাধুলার আয়োজনও হতো। হাডুডু ও ফুটবল ছিল তখন সবচাইতে জনপ্রিয় খেলা। ঈদের পরদিন প্রায় এলাকাতেই খুব ঘটা করে হাডুডু বা ফুটবল খেলা হতো। ঈদের দিন ঈদগাহ মাঠে বা প্রবেশের রাস্তায় নানান খেলনা ও বিভিন্ন রকম পণ্য সম্ভার নিয়ে বসতো ঈদের মেলা। ঈদের দিন ঘুরা-ফেরা বা আত্মীয়দের বাড়িতে বেড়ানো ছাড়া ঈদ আনন্দ যেন পূর্ণই হতো না। মসলিম শাসনের পর ধর্মীয় এবং সামাজিকভাবেই পালন হতো ঈদ উৎসব।১৯৪৭ সালে ইংরেজদের কবল থেকে স্বাধীনতা লাভ এবং দেশ বিভাগের পর মুসলমানদের রাষ্ট্ররূপে গড়ে ওঠে পাকিস্তান। তখন থেকে সরকারিভাবে সমর্থিত হয়ে খুব সমারোহের সাথে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় আমাদের দেশে ঈদ উদযাপন হয়ে আসছে। এরপর দিন বদলের হাওয়া লেগে নানা পরাবর্তনও আসে ঈদ উৎসবে। বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকা জগতে প্রকাশিত হতে থাকে জমকালো আকারে ঈদসংখ্যা। আর তাতে প্রকাশ পেতে লাগলো ঈদকেন্দ্রিক গল্প, উপন্যাস, কবিতাসহ নানা রকমের রচনা। হালুয়াঘাটে সাহিত্য সংস্কৃতিতে সজাগ ব্যক্তিদের উদ্দ্যোগেও ঈদ উপলক্ষে প্রকাশিত হতে থাকে সাহিত্য পত্রিকা ও ম্যাগাজিন। রমযানের চাঁদ উঠার সাথে সাথে ঈদ বাজারে আসতে থাকে নতুন নতুন আমদানি পর্ণদ্রব্য। বিভিন্ন ডিজাইনের জামা-কাপড়ে সেজে উঠে দোকানের শোকেস। রোযার প্রথম প্রথম দিন থেকে ব্যবসায়ীরা রাস্তার ধারে ও মোড়ে মোড়ে ইফতার সামগ্রী সাজিয়ে দোকান বসাতে শুরু করে। কড়াইতে তেল ঢেলে রাস্তার পার্শ্বেই ভাজতে শুরু করে ছোলাবুট, বেগুনি পেঁয়াজুসহ নানা রকমের ইফতারি দ্রব্য। কুরবানির ঈদে হালুয়াঘাট বাজারে বসে গরু ছাগলের বিশাল হাট। কয়েক বছর নতুন বাসস্ট্যান্ডের পূর্ব পাশে এবং হালুয়াঘাট আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠেও গরু ছাগলের হাট বসতে দেখা গেছে। বাঘাইতলা বাজার এবং ধারা বাজারেও বসে কুরবানির হাট। হালুয়াঘাটের মোট জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য একটি অংশ জীবিকার তাগিদে ঢাকাসহ সারা দেশে চাকরি ও নানা কাজ করেন। ঈদের আগে আগে তারা বাড়ি ফিরে স্বজনদের সাথে মেতে উঠেন আনন্দ-আপ্যায়নে। ঈদের এক সাপ্তাহ পর পর্যন্ত চলে ঈদ আনন্দের রেশ। হালুয়াঘাটের ঈদ উৎসব ধীরে ধীরে আরোও আজর্ষণীয় ও তাৎপর্যময় হয়ে উঠছে। বর্তমানে বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঘটনাপ্রবাহে ঈদোৎসবের চারিত্র্যে এনেছে নানা পরিবর্তন। দেশের কোটি কোটি মানুষের রুটি-রুজি,সংগঠন, আনন্দ, পেশাসহ বহু কিছুর সাথে এখন জড়িয়ে গেছে ঈদ।বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মত হালুয়াঘাটবাসীও একটু ভিন্ন আমেজে প্রতিটা ঈদই বিপুল উদ্দীপনার মাঝ দিয়ে উদযাপন করে। যা হালুয়াঘাটের ঐতিহ্যেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।
Shares